রাষ্ট্রীয় সম্পদ হরিলুটের অভিযোগে বিআইডব্লিউটিএ’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ। – দৈনিক মানবতার কন্ঠ

রাষ্ট্রীয় সম্পদ হরিলুটের অভিযোগে বিআইডব্লিউটিএ’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ।

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: March 17, 2026

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)—নদীমাতৃক বাংলাদেশের নৌপথ, নদীবন্দর ও টার্মিনাল উন্নয়নের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। এ সংস্থার মাধ্যমে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, যা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে এ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সততা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি।
কিন্তু সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক প্রকল্পে দুর্নীতি, অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ তছরুপের অভিযোগ সামনে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সংস্থাটির প্রকল্প পরিচালক ও প্রকৌশলী নিজাম উদ্দীন পাঠানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
নিয়োগ থেকে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার অভিযোগ।
সূত্রমতে, বিআইডব্লিউটিএতে কর্মরত এক আত্মীয়ের প্রভাব ও পরিচয়ের সূত্র ধরে নিজাম উদ্দীন পাঠান “অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার” পদে চাকরি লাভ করেন। পরবর্তীতে দায়িত্বে থাকাকালীন কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই সম্পর্ক ও যোগসাজশের মাধ্যমেই তিনি দ্রুত নির্বাহী প্রকৌশলী ও পরে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পদ বাগিয়ে নেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, এ পর্যায় থেকেই তিনি সংস্থার ভেতরে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার শুরু করেন এবং কার্যত “অঘোষিত ক্ষমতাকেন্দ্র” হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
বিপুল সম্পদের অসামঞ্জস্য :
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, নিজাম উদ্দীন পাঠানের নামে ও বেনামে রাজধানীর বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে—জে ব্লকে দুটি, এস ব্লকে একটি, সি ব্লকে তিনটি ছাড়াও আশপাশে প্লট ও অন্যান্য স্থাবর সম্পদের অভিযোগ রয়েছে। নোয়াখালীতে গ্রামের বাড়ি থাকলেও সেখানে তার স্থায়ী উপস্থিতি কম বলে স্থানীয়দের দাবি।
এছাড়া ব্যক্তিগত জীবন ঘিরেও নানা গুঞ্জন রয়েছে, যা তার ঘোষিত আয় ও জীবনযাত্রার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন।
বাঘাবাড়ি ও নগরবাড়ী প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাঘাবাড়ি নদীবন্দর ও নগরবাড়ী-বাঘাবাড়ি প্রকল্প। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজাম উদ্দীন পাঠান রাষ্ট্রীয় সম্পদ তছরুপ ও ব্যাপক অনিয়মে জড়িত ছিলেন। বাঘাবাড়ি নদীবন্দর আধুনিকায়নের নামে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পদ “আধুনিকায়ন” করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, মোহাম্মদ জাফর নামের এক ঠিকাদারকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়, যার বিপরীতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। বাস্তবে মাঠপর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কাজ না করেই ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে বিল উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে।
ঠিকাদারি যোগসাজশ ও ডেভেলপার ব্যবসা :
অভিযোগ রয়েছে, আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সঙ্গে যৌথভাবে ডেভেলপার ব্যবসায় জড়ান নিজাম উদ্দীন পাঠান। এছাড়া “এস এস রহমান কোম্পানি”-র মালিক মোহাম্মদ দিপুকে প্রায় ২৪০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও তদন্তাধীন।
সূত্র জানায়, এসব অনিয়মের কারণে প্রকল্পের নথিপত্র প্রস্তুত করে তার বিরুদ্ধে সচিবালয়ে অভিযোগ পাঠানো হয়েছে এবং ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও পারিবারিক কোটার অভিযোগ : অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বিআইডব্লিউটিএ’র প্রকৌশল বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে “পারিবারিক কোটায়” নিয়োগ ও পদোন্নতির অভিযোগ রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বা মৃত কর্মকর্তার আত্মীয়স্বজন বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পদে সুযোগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর ফলে যোগ্যতা ও মেধার পরিবর্তে প্রভাব ও সম্পর্কই হয়ে উঠছে পদোন্নতির প্রধান মানদণ্ড—যা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের জন্য উদ্বেগজনক।
রাষ্ট্রীয় স্বার্থে তদন্তের দাবি :
সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একাধিক প্রকল্পে বিল পরিশোধ, কাজের গুণগত মান ও ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে গুরুতর অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে একই কাজের জন্য একাধিকবার বিল উত্তোলন এবং কোথাও মাঠপর্যায়ে কাজ না করেই কাগজে সম্পূর্ণ দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণের স্বার্থে নিজাম উদ্দীন পাঠান ও তার পরিবারের নামে অর্জিত সকল সম্পদের উৎস তদন্ত ও অনুসন্ধানের জন্য যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রে ও জন স্বার্থেই প্রয়োজন—দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ তদন্ত, যাতে সত্য উদঘাটিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সম্পদের অপব্যবহার রোধ করা যায়।