‘সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে ইসরায়েল’, পরবর্তী নিশানা কে—তুরস্ক না পাকিস্তান – দৈনিক মানবতার কন্ঠ

‘সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে ইসরায়েল’, পরবর্তী নিশানা কে—তুরস্ক না পাকিস্তান

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 21, 2026

আজ হোক বা কাল, ইসরায়েলকে সিরিয়ার বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়াতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির প্রভাবশালী কট্টরপন্থী নেতা ও প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারগুলোয় মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘উগ্র সুন্নি অক্ষ’ বা শক্তিশালী ইসরায়েলবিরোধী জোট গড়ে উঠছে বলে উল্লেখ করে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই মন্ত্রী।

সিরিয়ার বর্তমান ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারের তীব্র সমালোচনা করে আমিচাই চিকলি বলেন, সিরিয়ায় এখন আইএস ও আল-কায়েদার আদর্শে বিশ্বাসী একটি ‘জিহাদি’ শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছে। যাদের মূল লক্ষ্যই হলো জেরুজালেম দখল করা। এমন একটি শক্তি কখনো ইসরায়েল রাষ্ট্রের পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করতে পারে না। তাই সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানো অসম্ভব।

বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের আর্মি রেডিওর সঙ্গে আলাপকালে আমিচাই চিকলি তাঁর দৃষ্টিতে গড়ে ওঠা নতুন এই ইসরায়েলবিরোধী জোটের একটি রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘পাকিস্তান, তুরস্ক ও কাতার মিলে এই নতুন শক্তিশালী জোট গঠন করেছে।’ এই জোট নিয়ে চিকলি এতটাই চিন্তিত যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির চেয়েও এটি তাঁকে ও তেল আবিবকে বেশি উদ্বেগে রাখছে। লিকুদ পার্টির এই মন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ইরান বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে, তবে তার চেয়েও মধ্যপ্রাচ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা এই নতুন সুন্নি অক্ষ অনেক বেশি বিপজ্জনক।

ইসরায়েলি এই মন্ত্রীর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘ আলোচনা ও সমঝোতার নেপথ্যে পাকিস্তান ও তুরস্ক বড় ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রেখেছে। আর এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তারা এই নতুন জোটের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, ‘কোল বারামা’ রেডিওকে দেওয়া অন্য এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই জোটে কাতারের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পারস্য উপসাগরীয় এই দেশটিকে ‘জিহাদিদের জনসংযোগ শাখা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

বিশ্বজুড়ে কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদদের সাথে সম্পর্ক রাখা চিকলি বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্ক হলো মূলত ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসের শত্রু, যারা আবার ইসরায়েলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র। বুধবার ‘১০৩এফএম’ রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, তুরস্ক, কাতার ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত এই কথিত উগ্র সুন্নি অক্ষটি অতীতে দেখা যেকোনো জোটের চেয়েও বেশি মারাত্মক।

তবে চিকলির মূল মনোযোগ ও আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তুরস্ক। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের দূরদর্শিতা বা লক্ষ্যকে ইসরায়েলের জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংমিশ্রণ বলে আখ্যা দেন তিনি। তাঁর মতে, তুরস্ক মূলত সিরিয়ায় একটি ‘তুর্কি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে তুরস্ক ও সিরিয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের জন্য ইরানের চেয়েও ১০ হাজার গুণ বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লিকুদ দলীয় এই মন্ত্রীর মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা ক্রমাগত তুঙ্গে মরছে। সম্প্রতি তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছেন, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসী হামলা তুরস্কের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকিস্বরূপ। চলতি মাসের শুরুর দিকে তুর্কি নেতা বিশ্বমঞ্চে হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, ‘ইসরায়েলকে অবশ্যই থামাতে হবে, এটি গোটা মানবতার দায়িত্ব।’ এর পাশাপাশি তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তফা চিফৎচি সম্প্রতি জেরুজালেম মুক্ত করার বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।

অবশ্য তুরস্কের কাছ থেকে হুমকি আসার কথা বলা প্রথম ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ নন চিকলি। গত সপ্তাহে লিকুদ পার্টিরই আরেক আইনপ্রণেতা আরিয়েল কেলনার তুরস্ককে একটি ‘শত্রু রাষ্ট্র’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ ছাড়া গত মাসে ইসরায়েলি সংস্কৃতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী মিকি জোহর বলেছিলেন, ইসরায়েলের অবশ্যই তুরস্ককে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত এবং সম্ভাব্য সংঘাত হলে তুরস্ককে ভারী আঘাত সইতে হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও মন্তব্য করেছিলেন, ‘তুরস্ক হলো নতুন ইরান।’

দীর্ঘ আড়াই বছরের যুদ্ধের পর ইসরায়েলিরা কি এখন একটু শান্তিময় সময়ের আশা করতে পারে?—রেডিওর এমন প্রশ্নের জবাবে চিকলি বলেন, তিনি শান্তি আশা করেন, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কারণ তুরস্কের খুব স্পষ্ট সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে এবং তারা ইসরায়েলের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ইসরায়েলের আঙ্কারা জয়ের কোনো পরিকল্পনা নেই এবং সিরিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধ না হলে তারা খুশিই হবেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে চিকলি বলেন, ‘শত্রু যখন কিছু বলে, আমি তা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনি।’