ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের কিছু ঘটনা মন থেকে মেনে নিতে পারছি না। প্রথম ঘটনা মহামান্য রাস্ট্রপতির ভাসনকে কেন্দ্রকরে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামাতে ইসলামী যে আচরণ করেছে তা সংসদীয় আচরণের পরিপন্থী এবং স্ববিরোধী। কেন সংসদীয় আচরণ হয়নি তা হলো জাতীয় সংসদ কোনো রাজপথ নয় কিংবা খেলার মাঠের গ্যালারী নয়। যেখানে আপনি আপনার মতামত প্রকাশের জন্য হাতে প্লেকার্ড নিয়ে দাড়িয়ে যাবেন। জনগণ আপনাকে তাদের মহামুল্যবান পবিত্র ভোটের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে পাঠিয়েছে আপনার মতামত প্রকাশের জন্য। প্লেকার্ড হাতে প্রতিবাদ করার জন্য নয়। রাস্ট্রপতির ভাসন নিয়ে আপনার প্রতিবাদ থাকলে আপনি আপনার ভাসনের মাধ্যমে প্রতিবাদ করতে পারতেন। কেন রাস্ট্রপতির ভাসন দেয়া ঠিক হয়নি আপনি দেশবাসীকে জানাতে পারতেন যুক্তি দিয়ে তথ্য দিয়ে। প্লেকার্ড দেখিয়ে এতো মৌন ও বাচ্চাসুলভ আচরণ করে কি বুঝাতে চাইলেন? আপনার কোন যুক্তি নেই তথ্য নেই যা আপনার বক্তৃতায় বলতে পারেন। তাই নয় কি?
স্ববিরোধী কেন হলো প্রশ্ন করতে পারেন। ৫ আগস্ট ২০২৪ যখন শেখ হাসিনার সরকার অকার্যকর করা হলো তার তিনদিন পর ৮ আগস্ট জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এই রাস্ট্রপতির কাছে শপধ বাক্য পাঠ করে উপদেষ্ঠা হয়েছিলেন। নাহিদের ভাষায় রাস্ট্রপতি তো ফ্যাসিস্টের দোসর। প্রধান উপদেষ্ঠা এবং তার উপদেষ্ঠা পরিষদ তাহলে কি অবৈধ? নাহিদ ইসলাম কি জবাব দিবেন। যে নির্বাচনের মাধ্যমে আপনি নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য হলেন সেই নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনারকে শপধ বাক্য পাঠ করিয়েছেন কে? এই ফ্যাসিস্ট রাস্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি অবৈধ হলে তার নির্বাচন কমিশনার বৈধ হয় কিভাবে।
দ্বিতীয় ঘটনা জাতীয় সংসদে মহামান্য রাস্ট্রপতি ভাসন দেওয়ার পূর্বে জাতীয় সঙ্গীত বেজে ওঠলে বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্য নিজেদের আসনে বসে ছিলেন। ট্রেজারীবেঞ্চ থেকে সরকারি দলের মহাসচিব, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জনাব ফখরুল ইসলাম আলগীর হাত দিয়ে ইশারাকরে বার বার দাড়ানোর জন্য বলেছেন। কিন্তু কেউ দাড়ায়নি। হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপির অনুরোধে শেষাবধী তারা দাড়িয়েছেন। এই যে জাতীয় পতাকার প্রতি অসম্মান এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে অদ্যবধি কোনদিন ঘটেনি। যেটি জামাতে ইসলামী একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো। নির্বাচনী জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলতেন দেশের প্রতি এবং মানুষের প্রতি সম্মান ও মঙ্গলজনক যা তাই তারা করবেন। দেশের এবং জাতির অসম্মান হয় এমন কাজ তার দল কখনও করবে না। তাহলে দেশের জনগণ প্রথম দিন জাতীয় সংসদে কি দেখলো। জাতীয় পতাকার প্রতি আপনাদের অসম্মান আপনাদের অতীত কার্যক্রমকে স্বরণ করে দেয়। বিষয়টির কোনো ব্যাখ্যা কি দিতে পারবেন বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ।
এবার আসি জাতীয় সংসদের সংস্কৃতি প্রসঙ্গে। জাতীয় সংসদ ভবন হলো একটি জাতির গর্বের এবং গৌরবের জায়গা। পবিত্র জায়গা তো বটেই। একটি দেশের জনগণের আশা আকাস্খার প্রতীক হলো সংসদ। যেখানে জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য তাদের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রপরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এখানে কথা, আচরণ সবকিছু পরিশিলিত, পরিমার্জিত এবং নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। সংসদের আচরণ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রী ব্যরিষ্টার মওদুদ আহমেদ তাঁর সুলিখিত বই ‘সংসদে যা বলেছি’ গ্রšহ থেকে হুবহু উদ্ধৃতি দিচ্ছি-‘সংসদকে গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যকর করার জন্য সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধি যথেষ্ট নয়। এর কতগুলি ঐতিহ্যগত শক্তিশালী দিক আছে যার অনেকটা নিরবচ্ছিন্ন সংসদীয় চর্চার ওপর নির্ভর করে। এখানে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আচার-আচরণ, মন মানসিকতা, জ্ঞান বিশ^াস, এবং সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি পারষ্পরিক সহনশীলতা এবং শ্রদ্ধাবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’ বিষয়টি হয়তো স্পষ্ট করা গেল। তাহলে প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দলের সদস্যদের যে অশালীন, মারমুখী আচরণ মহামান্য রাস্ট্রপতির সামনে প্রদর্শিত হয়েছে তা কি প্রত্যাশিত ছিল। জাতি হতাশ হয়েছে এহেন আচরণ দেখে।
জাতীয় সংসদকে অর্থবহ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাইলে রাজপথের ভাষা আর শরীরের জেসচাররের পরিবর্তন আনতে হবে। শব্দের ব্যবহার এবং উচ্চারণ শৈলীর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। মাননীয় স্পীকার যেহেতু সংসদ অধীবেশনের সভাপতি এবং তিনি সংসদ পরিচালনা করেন সেহেতু সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিজ নিজ দলের চীফ হুইপের মাধ্যমে বক্তৃতা বিবৃতি প্রস্তাব পেশ করার জন্য অধীবেশনের শুরতে নোটিশ দিয়ে রাখলে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী কথা বলার সংস্কৃতি বহাল থাকবে। ইচ্ছে হলো আর আপনি দাড়িয়ে গেলেন এমনটি সংসদীয় আচরণ নয়। মুখে যা আসবে তা বলাটাও শোভন নয়। বিশে^র বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টের দৃষ্টান্ত দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের নামকরা কিছু পার্লাম্যান্টারিয়ানের নাম করা যায় যাদের কথা শুনার জন্য সরকারি বা বিরোধী দলের উভয় সদস্যরা আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতো। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মাহমুদ আলী (সিলেট), আতাউর রহমান খান, মওলানা আব্দু রশীদ তর্কবাগীশ, তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন তুখোড় বক্তা, যুক্তিবাদী। বাংলাদেশ আমলে বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ব্যারিষ্ট্রার মওদুদ আহমেদ, তোফায়েল আহমদ, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, মইনদ্দিন খান বাদল (চট্টগ্রাম) সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছিলেন কিংবদন্তি পার্লাম্যান্টারিয়ান।
জাতীয় সংসদের মুল কার্যাবলী পরিচালিত হয় কার্যাপ্রণালী বিধির দ্বারা। যা সংধিানের ৭৫ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রণীত। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে স্পিকারের দায়িত্ব হলো কার্যপ্রণালী বিধির আলোকে সংসদ পরিচালনা করা। সরকারের কার্যক্রম অনুবিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ এবং গঠনমুলক সমালোচনা করার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন করা বিরোধী দলের কাজ। সরকারের স্বচ্ছতা জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা সংদের কাজ। সরকার পরিচালনা সংসদের কাজ নয়। এক্ষেত্রে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং বিভিন্ন কমিটির অর্থবহ কার্যক্রম সংসদকে গতিশীল রাখে। সরকারি দলের উচিৎ বিরোধী দলের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি পদ দেয়া। যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। বিরোধী দলের সদস্যদের গঠনমুলক ভুমিকা সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলতে সহায়ক হয় সর্বদাই।
আশাকরি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধীবেশনের ভূল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী অধিবেশনগুলো সুচারুভাবে পরিচালিত হবে। একজন নাগরিক হিসেবে এটাই প্রত্যাশা।
লেখক
জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক