রোকন বিশ্বাস-পাবনা প
পাবনার ফরিদপুর উপজেলার পুংগলী ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রশাসনিক দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদের সচিব জমিন উদ্দিন এবং ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা সুবুজ মোল্লার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলেছেন পরিষদের একাধিক নির্বাচিত সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা লিখিত অভিযোগে বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, সচিব জমিন উদ্দিন সরকারি অনুদান ও বিভিন্ন ভাতাভোগীর তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন এবং ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বঞ্চিত করছেন। জন্ম ও মৃত্যু সনদ, নাগরিক সনদসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উদ্যোক্তা সুবুজ মোল্লার বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনে অযোগ্যতার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র পঞ্চম শ্রেণি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব রয়েছে। ফলে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে অনলাইনভিত্তিক সেবাগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না।
জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, জন্মনিবন্ধন, অনলাইন ফরম পূরণ, সরকারি আবেদনপত্র জমা দেওয়াসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে বারবার ইউনিয়ন অফিসে আসতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিজের অযোগ্যতা আড়াল করতে উদ্যোক্তা অন্যের মাধ্যমে কাজ করিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের ভিজিডি কার্ড বিতরণ ও তালিকা প্রণয়ন কার্যক্রমেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় নারীদের বাদ দিয়ে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। ফলে অনেক দরিদ্র পরিবার এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এমনকি কিছু কার্ডধারী চাল উত্তোলনের সময় ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় মাতৃত্বকালীন ভাতা বণ্টনের ক্ষেত্রেও অনিয়ম হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিষদের ইউপি সদস্যদের না জানিয়ে সচিব জমিন উদ্দিন ও উদ্যোক্তা সুবুজ মোল্লা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে মাতৃত্বকালীন ভাতার চূড়ান্ত তালিকা পাঠিয়েছেন। এতে পুংগলী ইউনিয়নের বাইরের অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দারাও সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইউপি সচিব জমিন উদ্দিন বলেন, “এর আগে আমাদের একজন প্রশাসক দায়িত্বে ছিলেন। প্রশাসকের আমলে বিভিন্ন বিষয়ে তার সঙ্গে অসদাচরণ করার অভিযোগে অনেক মেম্বার দাবি করছেন, তারা তুলনামূলক কম প্রকল্প পেয়েছেন, অন্যদিকে কিছু মেম্বার বেশি পেয়েছেন এ নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
স্যারের বদলির আদেশ হওয়ার পর তাদের মধ্যে প্যানেল চেয়ারম্যান হওয়ার চিন্তা আসে। তখন পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে একটি অভিযোগ তুলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। আমার মতে, এটি একটি ভুয়া ও অসত্য অভিযোগ।
প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রশাসক মহোদয় মেম্বারদের সঙ্গে নিয়ে যাচাই-বাছাই করেই তালিকা প্রণয়ন করেছেন। বর্তমানে যারা অভিযোগ করছেন, তারা হয়তো প্রত্যাশার তুলনায় কম সুবিধা পেয়েছেন। মূলত মেম্বারদের মাধ্যমেই উপকারভোগীদের তালিকা নেওয়া হয় এবং তারাই যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত করেন।”
তবে সচিবের এমন বক্তব্য ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কেন মেম্বাররা তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুললেন? এর পেছনে প্রকৃত কারণ কী? নাকি নিজের অনিয়ম আড়াল করতেই তিনি এমন বক্তব্য দিচ্ছেন এ নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে উপজেলা থেকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) দায়িত্ব পালন করলে, তার সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ থাকলে কেন সেই অভিযোগে ইউপি সচিবের নামও উঠে এসেছে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজলেই প্রকৃত ঘটনার চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্যোক্তা সবুজ আলীর দূর্নীতি অনিয়ম ও নিয়োগ সংক্রান্ত নিয়ে বলেন,আমরা উদ্যোক্তা হইতো চুক্তিভিত্তিক,আপনাকে যেটা বলা হইছে সেইটা দিয়ে সংবাদ করছেন একশো একশো বলে স্বীকার করলেন।জনপ্রতিনিধিদের জনপ্রিয়তা আছে বলেই নির্বাচন করছে।
মুক্তা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, তিনি মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে রাজুকে ৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। ঘুষের এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে সক্রিয় একটি দালাল চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়।
তদন্তে জানা যায়, এই চক্রের একজন সক্রিয় সদস্য পুঙ্গলী আমিনা নবাবজান দাখিল মাদ্রাসার ঝাড়ুদার রাজু। তিনি সাংবাদিক রোকন বিশ্বাসের কাছে স্বীকার করেন যে, ১ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রী-গোবিন্দপুর এলাকার উদ্দিন হোসেনের স্ত্রী আয়শা খাতুনের মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্ড করে দিতে তিনি ৩ হাজার টাকা নিয়েছেন।
এদিকে, মধ্যপুঙ্গলী এলাকার বাসিন্দা মুক্তা খাতুনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তার পিতার বাড়ি ও স্বামীর বাড়ি উভয়ই মধ্যপুঙ্গলীতে হলেও তার মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্ডে ঠিকানা হিসেবে ১ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রী-গোবিন্দপুর উল্লেখ করা হয়েছে যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দালাল চক্রের সদস্য রাজু আরও জানান, তিনি আগে ইউনিয়ন পরিষদে বসতেন, তবে বর্তমানে আর বসেন না। কেন বসেন না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাবমার্সিবল মোটর সংক্রান্ত একটি ঝামেলার কারণে তিনি সেখানে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে, নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে রাজু সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান কারা তার নামে অভিযোগ করেছেন। অভিযোগকারীর নাম প্রকাশ না করায় তিনি ফোনে মামলার হুমকি দেন। এ বিষয়ে সাংবাদিক রোকন বিশ্বাস তাকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেন।
সাংবাদিকদের মতে, কোনো ব্যক্তি তথ্য দিলে তার পরিচয় গোপন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে অপরাধ বা অনিয়মের তথ্য দিতে নিরুৎসাহিত হবে এবং অভিযোগ জানানোর পথও সংকুচিত হয়ে পড়বে।
এছাড়া উপজেলা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বর্ধিত উপকারভোগীর তালিকা প্রেরণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের না জানিয়ে ঘুষের বিনিময়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। ফলে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলো এই কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
স্থানীয়দের মতে, এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে এবং ইউনিয়ন পরিষদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের দাবি, এর আগেও এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের পর ফরিদপুর উপজেলার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব হাসান এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।এদিকে আমাদের ইউপি সচিব আলেম এর লিভাস ধরে লম্বা টুপি পরে ফুল শয়তানের মত বেশ ধরে জনগনকে ধোকা দিচ্ছে, দায়িত্বশীল জায়গা থেকে আমাদের মত সাধারণ জনগনকে প্রতিনিয়তই ধোকার মধ্যে ফেলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে যা শয়তানও এতোবড় শয়তানি করে না।
ভুক্তভোগীরা জানান, গত ৫ আগস্টের পর ফরিদপুর উপজেলার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব হাসানের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। সে সময় ইউনিয়নে নির্বাচিত চেয়ারম্যান না থাকায় প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)। তাকে বিষয়টি অবগত করলে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। সেই অনুযায়ী অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন অভিযোগকারীরা।
তাদের দাবি, পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব হাসান বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। বর্তমানে নতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগকারীদের আশা, নতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করলে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, উদ্যোক্তা সুবুজ মোল্লা এলাকায় প্রকাশ্যে বলে বেড়ান তার বিরুদ্ধে কেউ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না। এমনকি তিনি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কথাও উল্লেখ করেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগেও আর্থিকভাবে অসচ্ছল অবস্থায় বাঁধের ওপর একটি ছোট কক্ষে বসবাস করতেন সুবুজ মোল্লা। কিন্তু উদ্যোক্তা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তার আর্থিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন এই পরিবর্তনের উৎস কী?
এলাকাবাসী এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে উদ্যোক্তা সুবুজ মোল্লা ও তার আশ্রয়-প্রশ্রয়কারীদের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ইমামা বানিন বলেন, এই অভিযোগের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং আমরা তা খতিয়ে দেখছি। প্রশাসনিকভাবে তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। বর্তমানে ঈদের ছুটি চলমান রয়েছে। ছুটি শেষে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।